স্থায়ী কমিটির বৈঠক শরিকদের আসন ছাড়ের উদ্যোগ বিএনপির
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
বুধবার, ডিসেম্বর ১০, ২০২৫ ৪:৪২ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
বুধবার, ডিসেম্বর ১০, ২০২৫ ৪:৪২ অপরাহ্ণ

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা শরিকদের আসন ছাড়কে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংকট নিরসনের উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি। যে আসনে শরিক প্রার্থীদের বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে সেই সব আসনে ছাড় দেওয়া এবং আলোচনা শেষে শিগগির আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। পাশাপাশি শরিকদের আসনে ঘোষিত অন্তত তিনটি আসনে প্রার্থীদের পুনর্বিবেচনার চিন্তাও করছে হাইকমান্ড। গত সোমবার রাতে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এমন আলোচনা হয়েছে। বিএনপির নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে এসব তথ্য।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে শরিকদের সঙ্গে আলোচনা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা দুই-একদিনের মধ্যে শরিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত রিপোর্ট বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়াম্যান তারেক রহমানের কাছে জমা দেবেন। এর অংশ হিসেবে আজ বুধবার ১২ দলীয় জোটের সঙ্গে বৈঠক করবে বিএনপি। এ ছাড়া দ্রুততম সময়ে পর্যায়ক্রমে গণতন্ত্র মঞ্চ ও জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের সঙ্গেও বসবে দলটি। এ ছাড়া বৈঠকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে দেশে রেখে চিকিৎসা, এক কোটি প্রবাসীর ভোটাদান ও ব্যালট পেপার ছাপানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, স্থায়ী কমিটির বৈঠকে কোনো কোনো সদস্য উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এবার ধানের শীষ প্রতীকে জোট শরিকরা ভোট করতে পারবেন না। এতে শরিক দলের অপরিচিত মার্কা নিয়ে প্রার্থীরা নির্বাচন করলে জয়ী হয়ে আসতে বেগ পেতে হবে। শুধু আসন ছাড়লেই হবে না, তাদেরকে জিতিয়েও আনতে হবে। দলটি চায় না, মিত্রদের জন্য ছাড়া আসন জামায়াতের কাছে চলে যাক। একই সঙ্গে জোটের ঐক্যও টিকিয়ে রাখতে চান তারা। কোনো কোনো সদস্য মত দেন, শরিক নেতাদের মধ্যে যাদের বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তাদেরকে আসন ছাড় দেওয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে সংসদীয় আসনে বিএনপির প্রার্থীদের সঙ্গে জোটের প্রার্থীদের এলাকায় জনপ্রিয়তা, নিজস্ব পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা তুলনা করেই বাছাই করার পরামর্শ দেন কেউ কেউ। আবার কেউ কেউ মতামত দেন, যেসব শরিকদের এবার আসন ছাড় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না তাদের অন্যভাবে মূল্যায়ন করা হবে। বিশেষ করে সংসদের উচ্চকক্ষসহ বিভিন্ন সেক্টরে তাদেরকে মূল্যায়ন করা যেতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেন, যেহেতু দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষণা করেছেন যে, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে যুগপৎ আন্দোলনের মিত্র রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে জাতীয় সরকার গঠন করা হবে,তাই নিশ্চিত পরাজয় জেনেও ধানের শীষবিহীন মিত্র দলের নেতাকে প্রার্থী করা ঠিক হবে না। সেক্ষেত্রে নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি প্ল্যাটফর্ম গঠন করা যেতে পারে। এই প্ল্যাটফর্মের নাম হতে পারে ‘ডেমোক্র্যাটিক রিফর্ম অ্যালায়েন্স’। এই প্ল্যাটফর্মে মিত্র রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের কার্যক্রম পরিচালনা করবে। ক্ষমতায় গেলে উচ্চকক্ষসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যোগ্যতা অনুযায়ী দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।
স্থায়ী কমিটির বৈঠকে কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে ১২ দলীয় জোটের শরিক ও জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা, নড়াইল-২ আসনে এনপিপি চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ এবং ঝালকাঠি-১ আসনে লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরানের আসনে প্রার্থী ঘোষণা নিয়েও আলোচনা হয়। এই তিন আসনে প্রার্থী পুনর্বিচেনার চিন্তা-ভাবনা করছে বিএনপির হাইকমান্ড। তবে গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সুব্রত চৌধুরী এবার নির্বাচন অংশ নিতে চাইছেন না। ফলে তাকে সংসদের উচ্চকক্ষে নেওয়ার চিন্তা রয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।
জানা গেছে, আসন ছাড়ের বিষয়ে শিগগির শরিকদের দলের সঙ্গে বৈঠকে বসবে বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা। গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় দলটির গুলশানের কার্যালয়ে মিত্রদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন দলটির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। ধাপে ধাপে অন্য দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করবে। সূত্র জানায়, শরিকদের এবার ২০টির মতো আসন ছাড় দেবে বিএনপি। ইতোমধ্যে কয়েকটি আসনে সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছে। মিত্র প্রার্থীরা নিজ নিজ আসনে প্রচার, গণসংযোগ করছেন।
১২ দলীয় জোটের শরিক ও জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিএনপি মহাসচিবের আগামীকাল (আজ) আমাদের সঙ্গে আলোচনা করার কথা রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা বিএনপির সঙ্গে দীর্ঘ সময় আন্দোলন করেছি, এখনো বিএনপির সঙ্গে আছি।’
গণতন্ত্র মঞ্চের অন্যতম নেতা ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘দুই-একদিনের মধ্যে আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে।’
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা আসন সমঝোতার কাছাকাছি আছি। খুব বেশি সমস্যা হবে না। আশা করি, দুই-একদিনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা চলে আসবে। যে আসনে শরিকদের জয়ের সম্ভাবনা আছে সেসব আসনে হয়তো ছাড় দেবে বিএনপি।
বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, ‘বিএনপির সঙ্গে আমাদের ২০ বছরের সম্পর্ক আনুষ্ঠানিকভাবে ছিন্ন করেছি। সেক্ষেত্রে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগেরও কিছু নেই। আমরা বিএনপির যোগাযোগের অপেক্ষায় নেই। তবে কেউ যদি ফোন দেয় বা আলোচনা করতে চায় তাহলে অবশ্যই আলোচনা করতে রাজি আছি।’
শরিকদের সঙ্গে আসন সমঝোতা করতে দেরি হওয়ায় অনেকেই হতাশা প্রকাশ করেছে। মিত্ররা বলছেন, দীর্ঘ ১৫ বছর ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতনের দাবিতে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি। কিন্তু শরিকদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই প্রার্থী ঘোষণা করেছে বিএনপি। দীর্ঘ দিন ধরে অনেক হেভিওয়েট প্রার্থী এলাকায় কাজ করছেন, এমন আসনে প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। এতে শরিকদের মনোকষ্ট ক্রমেই বাড়ছে। বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা ভাবছেন কেউ কেউ।
এ ছাড়া স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এক কোটি প্রবাসী ভোটারের ভোটদান, ব্যালট পেপার ছাপানো ও ভোটদানের সময়সীমা এক ঘণ্টা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। কোনো কোনো সদস্য অভিমত ব্যক্ত করেন, সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত করা হয়েছে। শীতের সময় এত সকালে কারা ভোট দিতে যাবেন! তা নিয়ে অনেকে সন্দিহান।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দুই দফায় ২৭২ আসনে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেছে বিএনপি। প্রথম ধাপে ৩ নভেম্বর ২৩৭টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করার একদিন পর মাদারীপুর-১ আসনের প্রার্থিতা স্থগিত করে দলটি। আর দ্বিতীয় ধাপে ৩৬টি প্রার্থী ঘোষণা করেছে বিএনপি। এই ধাপে প্রার্থী ঘোষণার পর বিএনপির সঙ্গে দীর্ঘ ২০ বছরের রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান।
জনতার আওয়াজ/আ আ