একজন শিক্ষকের বিদায়ে কাঁদল পুরো বিদ্যালয়
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
শুক্রবার, মে ২২, ২০২৬ ৩:৪১ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
শুক্রবার, মে ২২, ২০২৬ ৩:৪১ পূর্বাহ্ণ

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি
ছবি: প্রতিনিধি
ফুল হাতে সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে আছে শত শত শিক্ষার্থী। দুই পাশে তৈরি হয়েছে ভালোবাসার মানবসারি। সেই পথ ধরে সহকর্মী শিক্ষকদের সঙ্গে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছেন সবার প্রিয় মানুষ, গিলাবাড়ী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক মো. শাহজাহান-ই-হাবীব। আর ঠিক তখনই শিক্ষার্থীদের হাতে থাকা ফুল ঝরে পড়ছে তার ওপর; পুষ্পবৃষ্টিতে ভেসে উঠছে বিদায়ের আবেগঘন মুহূর্ত।
কেউ গোলাপ হাতে এগিয়ে এসে প্রিয় স্যারকে জড়িয়ে ধরছে, কেউ পা ছুঁয়ে নিচ্ছে দোয়া, আবার কেউ কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছে ‘স্যার, আপনাকে ভুলবো না।’ বিদায়ের এই দৃশ্যে আবেগ সামলাতে পারেননি শিক্ষক, শিক্ষার্থী এমনকি অতিথিরাও। দীর্ঘ সাড়ে ৩২ বছরের শিক্ষকতা জীবনের ইতি টেনে চোখের জলে বিদায় নিলেন ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গিলাবাড়ী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক মো. শাহজাহান-ই-হাবীব।

বৃহস্পতিবার (২১ মে) সকালে বিদ্যালয় মাঠে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আয়োজনে তার অবসরজনিত বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়। পুরো বিদ্যালয়জুড়ে তখন এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
অনুষ্ঠানে দেখা যায়, প্রিয় শিক্ষকের বিদায় মেনে নিতে পারছিল না শিক্ষার্থীরা। কেউ স্যারের গলা জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদছে, কেউ হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে নির্বাক হয়ে। আবার অনেকেই চোখের পানি মুছতে মুছতে শেষবারের মতো স্মৃতিবন্দি করতে ব্যস্ত ছিলেন প্রিয় মানুষটিকে। শিক্ষার্থীদের এমন ভালোবাসা দেখে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন শাহজাহান-ই-হাবীব নিজেও।
বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা শিক্ষা অফিসার মো. শাহীন আখতারসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
জানা গেছে, মো. শাহজাহান-ই-হাবীব ১৯৬৬ সালের ৬ জুন ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। এমএ ও বিএড সম্পন্ন করার পর ১৯৯৪ সালের ১ জানুয়ারি নিজ এলাকায় শিক্ষা বিস্তারের স্বপ্ন নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন গিলাবাড়ী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়। ১৯৯৫ সালের জানুয়ারিতে বিদ্যালয়টির একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই তিনি প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

তার নেতৃত্বে বিদ্যালয়টি শুধু শিক্ষাক্ষেত্রেই নয়, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, ক্রীড়া ও জাতীয় দিবসের বিভিন্ন আয়োজনে একাধিকবার শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে। তিনি একবার জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হন এবং তার হাতে গড়া প্রতিষ্ঠানটি দুইবার জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
শুধু শিক্ষাবিদ হিসেবেই নয়, সমাজসেবক ও জনপ্রতিনিধি হিসেবেও তিনি ছিলেন সমানভাবে প্রশংসিত। প্রায় ১৩ বছর মোহাম্মদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। চেয়ারম্যান থাকাকালে টানা পাঁচবার জেলার শ্রেষ্ঠ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
শিক্ষার্থীরা জানান, স্যার শুধু আমাদের পড়াশোনা শেখাননি, মানুষ হওয়ার শিক্ষাও দিয়েছেন। বিদ্যালয়ে কোনো সমস্যা হলে বাবার মতো পাশে দাঁড়াতেন। আজ স্যারকে বিদায় দিতে গিয়ে মনে হচ্ছে আমাদের অভিভাবককে হারাচ্ছি। স্যারের শাসন ছিল, কিন্তু সেই শাসনের মধ্যেই ছিল ভালোবাসা। আমরা ভুল করলে তিনি বুঝিয়ে দিতেন। আজ স্যারকে ছাড়া স্কুল কল্পনা করতেই কষ্ট হচ্ছে।

তারা আরও বলেন, আমরা যখন স্কুলে আসতাম, স্যার গেটেই দাঁড়িয়ে খোঁজ নিতেন। অসুস্থ হলে ফোন করে খবর নিতেন। এমন একজন শিক্ষক হয়তো আর কখনো পাবো না।
আজ স্যারকে বিদায় দিতে গিয়ে পুরো স্কুলটাই যেন কাঁদছে। স্যার চলে গেলেও তার শেখানো আদর্শ ও স্মৃতি আমাদের মাঝে সবসময় বেঁচে থাকবেবিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা বলেন, দীর্ঘ ৩২ বছর ৪ মাস ২০ দিনের শিক্ষকতা জীবনে শাহজাহান-ই-হাবীব স্যার শুধু একজন প্রধান শিক্ষক ছিলেন না, তিনি ছিলেন এই বিদ্যালয়ের প্রাণ। তার শূন্যতা কখনো পূরণ হওয়ার নয়। তিনি চলে গেলেও তার আদর্শ ও স্মৃতি বিদ্যালয়ের প্রতিটি ইটের সঙ্গে মিশে থাকবে।

অনুষ্ঠানে তাকে সম্মাননা স্মারক, উপহার সামগ্রী ও ফুলেল শুভেচ্ছা প্রদান করা হয়। পরে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তাকে গাড়িবহরে বাড়ি পৌঁছে দেন। বিদায়ের পুরো সময়জুড়ে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছিল এক আবেগঘন নীরবতা।
বিদায়ী বক্তব্যে শাহজাহান-ই-হাবীব বলেন, ১৯৯৪ সালের ১ জানুয়ারি গিলাবাড়ী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে আমার শিক্ষকতা জীবন শুরু হয়েছিল। আজ প্রায় ৩৩ বছরের সেই পথচলার সমাপ্তি হলো। একসময় অবহেলিত এই জনপদে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে বিদ্যালয়টি গড়ে তুলেছি। এই দীর্ঘ যাত্রায় যারা পাশে ছিলেন, সবার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। বিদ্যালয়ের উন্নয়ন ও কল্যাণে আগামীতেও আমি পাশে থাকবো।
জেলা শিক্ষা অফিসার মো. শাহীন আখতার বলেন, একজন আদর্শ শিক্ষক কখনো অবসরে যান না, তিনি বেঁচে থাকেন তার শিক্ষার্থীদের মাঝে। মো. শাহজাহান-ই-হাবীব স্যার দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় ধরে এই অঞ্চলের শিক্ষার আলো ছড়িয়ে গেছেন। একটি অবহেলিত জনপদে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে হাজারো শিক্ষার্থীকে আলোকিত করেছেন, যা সত্যিই প্রশংসনীয়। তার কর্ম, সততা ও শিক্ষার প্রতি নিষ্ঠা আগামী প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।
জনতার আওয়াজ/আ আ