মাজারে হামলা' বিরোধী মতের ওপর আক্রমন - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ৯:২৬, সোমবার, ১৮ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৪ঠা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১লা জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

মাজারে হামলা’ বিরোধী মতের ওপর আক্রমন

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: সোমবার, মে ১৮, ২০২৬ ৭:২৬ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: সোমবার, মে ১৮, ২০২৬ ৭:২৬ অপরাহ্ণ

 

এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া
বাংলাদেশ অলি আল্লাহর দেশ। এখানে হাজার বছর যাবত চলে আসছে সুফী ধারা। বাংলাদেশের বিভিন্ন দরবার, মাজারে লক্ষ-কোটি ভক্ত আসা যাওয়া করেন। এই অঞ্চলে মাজার, মন্দির, সুফী, সাধুদের নিয়ে সমাজে নানা দ্বিধা-দ্বন্দ, মত ও পথের ফারাকা থাকলেও এই নিয়ে সংঘর্ষ বা আক্রমনের মত ঘটনা খুব বেশী দেখা যায় না। কিন্তু, আওয়ামী ফ্যাসীবাদী সরকারের পতনের পর উগ্র সাম্প্রদায়িক একটি গোষ্টি হঠাৎ করে মাজার, দরবার, বাউল গানের আশরের উপর হামলা, সূফী-সন্নাসীদের খুন করার মত ঘটনা ঘটিয়েছে একের পর এক। আর এই সুযোগে রাষ্ট্র বিরোধী অংশও বাংলাদেশের জনগনের মাঝে ধর্মীয় বিভক্তি আরো বেশি বৃদ্ধি করে হয়তো বাংলাদেশটাকে অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিনত করার নীলনক্সা বাস্তবায়নের পথে হাটছে। মাজারে, দরবারে হামলা, সূফী ও সন্নাসীকে হত্যা, কবর থেকে লাশ উঠিয়ে রাশ পুড়িয়ে ফেলা ধর্মের নামে জনগণকে ভাগ করার নতুন ফাঁদ ছাড়া আর কিছুই নয়। যার সর্বশেষ শিকার প্রখ্যাত সূফী সাধক হযরত শাহ আলী বোগদাদী (রহ.) এর মীরপুর মাজারে হামলা। রাজধানীর মিরপুরে হজরত শাহ আলী বাগদাদীর মাজারে হামলার ঘটনা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন সহিংসতা নয়, বরং সাম্প্রতিক বাংলাদেশে ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ, নাগরিক নিরাপত্তা এবং আইনের শাসনের ওপর চলমান চাপের আরেকটি উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত।

মাজার, দরবার, খানকা, আখড়া বা সাধকদের স্মৃতিস্থান —এগুলোকে কেবল “কবরপূজা” বা “কুসংস্কার” বলে উড়িয়ে দেয়া বাংলাদেশের ইতিহাস, সমাজ ও মানুষের আত্মীক জীবনকে অস্বীকার করা ও অপমান করা। বাংলার সাধারণ মানুষ শত শত বছর ধরে মাজারকে শুধু ধর্মীয় স্থান হিসাবে চিহ্নিত করে না। তারা এই সকলকে দেখে আশ্রয়, দোয়া, মিলন, খাদ্য, মুসাফিরি, গান, কান্না, স্মৃতি, প্রতিবাদ ও দরিদ্র মানুষের মর্যাদার স্থান হিশাবে। এইসকল স্থানে ইসলাম, স্থানীয় সমাজ, ফকিরী-দরবেশী ধারা, বৈষ্ণব সহজিয়া, নদীয়ার ভাব, পীর-মুরিদি সম্পর্ক, আখড়া ও জনজীবনের বহু স্তর এসে মিশে গেছে। সুতরাং মাজার-বিরোধী ঘৃণামূলক ভাষা আসলে শুধু একটি ধর্মীয় মতের বিরোধিতাই নয়, এটা বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সামাজিক ইতিহাসের বিরুদ্ধে ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক আক্রমণ।

আমাদের দেশে ছোট-বড় অনেক মাজার রয়েছে। সব মাজারেই আগত লোকজনের মধ্যে একটা বিশ্বাস কাজ করে। কারো মধ্যে সেই বিশ্বাস নাও থাকতে পারে। যার বিশ্বাস নাই সে যাবে না। কিন্তু যাঁদের আছে, তাঁদের কেউ বাধা দেবেন কোন যুক্তিতে? অথচ সেই কাজটাই প্রায় দুই বছর ধরে দেখা যাচ্ছে আমাদের দেশে। কেউ মাজারে যাবে কি যাবে না, পীর মানবে কি মানবে না, ওরস করবে কি করবে না—এটা বিশ্বাস, বিবেক ও সামাজিক চর্চার বিষয়। কিন্তু কেউ যদি রাষ্ট্র, প্রশাসন বা পুলিশের ছায়ায় দাঁড়িয়ে মাজার-বিরোধী উস্কানি দেয়, তাহলে সেটা আর নিছক ধর্মীয় মতভেদ আর থাকে না। সেটা হয়ে উঠে এক ধরনের ফ্যাসীবাদী আচরন, সেটা ক্ষমতার ভাষা হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রের কাজ কোনো বিশেষ মাজহাব, তরিকা বা ধর্মীয় মতকে অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেয়া না। রাষ্ট্রের কাজ নাগরিকের জান-মাল, ইবাদত, স্মৃতি, কবরস্থান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক অধিকার সুরক্ষা করা। প্রশাসন যদি মাজারবিরোধী শক্তির সঙ্গে আপস করে, চোখ বন্ধ করে থাকে অথবা তাদের ভাষা ধার নেয়, তাহলে অবশ্যই বলা যাকে সে আইনের শাসন প্রতিষ্টার পেছনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। একই সাথে ধর্মীয় সন্ত্রাসের দিকে দেশ ও সমাজকে ঠেলে দিচ্ছে।

মাজারে যারা যান তারা একটি বিশ্বাস ও ভক্তি নিয়ে যান। কিছু ধান্দাবাজ যে যান না, তা নয়। সে রকম ধান্দাবাজেরা তো মসজিদেও যান, মাদ্রসায়ও দান করেন। কিন্তু মূলত যাঁরা মাজারে যান, তাঁরা একটা প্রবল বিশ্বাস নিয়েই যান। তাঁদের চোখমুখে সে বিশ্বাস পড়া যায়। এ বিশ্বাসকে কেউ উপেক্ষা করতে পারেন না ? ২০২৪-এর আগস্টে ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই মাজারবিরোধীদের তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। এক হিসাবে দেখা যায়, ২০২৪-এর ৫ আগস্ট থেকে ২০২৫-এর ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে দেশে এক শর মতো মাজারে আগুন দেওয়া বা ভাঙচুর করা হয়েছে। এই সময়টা ছিল ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামল। একটা পরিবর্তন বা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের। তারা মাজারের ওপর হামলাগুলোকে যেমন প্রতিরোধ করেনি, তেমনি তারা হামলার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনার চেষ্টাও করেনি। তারা এগুলো জাস্ট হতে দিয়েছে। কেবল মাজারই নয়, দেশজুড়ে থাকা বাউলশিল্পীদের ওপর হামলা হয়েছে। বাউলগানের অনুষ্ঠানগুলোতে হামলা করে ভন্ডুল করে দেওয়া হয়েছে। সেই সময়টাকে মাজার বা মাজারপন্থীদের ওপর হামলায় সরকার যখন চুপ থাকত, তার কোনো প্রতিবাদ করত না দেশের দু’একটি দল ছাড়া রাজনীতিতে প্রভাশালী বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি এই দলগুলোর কেউই। আর আশকারা পেয়ে দুর্বৃত্তরা এই ভূখণ্ডে যে অপকর্ম কখনোই ঘটেনি, সেই আকামও করে দেখাল, কবর থেকে মৃতদেহ তুলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিল। নিরুদ্বিগ্ন সরকার সেটাও চেয়ে চেয়ে দেখল, কোনো প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিল না। গত ১২ ফেব্রুয়ারী দেশে নির্বাচন হলো। একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলো, সংসদ প্রতিষ্ঠিত হলো। তাহলে এখন কেন মীরপুরে শাহ আলী (রহ.)এর মাজারে হামলা হয় ? এখন প্রশ্ন, এই যে গণতান্ত্রিক সরকারের সময় মাজারের ওপর হামলা, এটা কি কোনো ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষণ কি ?

রাজধানীর মীরপুরে ঐহিত্যবাহী হযরত শাহ আলী বোগদাদী (রহ.) এর মাজারে গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে লাঠিসোঁটা হাতে একদল লোক মাজারে ঢুকে জিয়ারতকারীদের মারধর করে এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। প্রত্যক্ষদর্শী, স্থানীয়রা এবং পুলিশের একাধিক বক্তব্যে ঘটনার বিবরণে অসামঞ্জস্য থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট : আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সংস্কৃতি ভয়াবহভাবে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। এ ঘটনায় কারা জড়িত, তা তদন্তের আগেই রাজনৈতিক দোষারোপ চলছে। স্থানীয়দের কেউ কেউ হামলায় জামায়াতে ইসলামীর কর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছেন; পুলিশও ‘তাদের কিছু লোক থাকতে পারে’ বলে ইঙ্গিত দিয়েছে। অন্যদিকে দলটি সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, হামলাকারী যে-ই হোক, শতাধিক মানুষের উপস্থিতিতে, পুলিশের গাড়ি মাজারের বাইরে থাকা সত্ত্বেও কেন তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ হলো না? রাষ্ট্রের উপস্থিতি যদি কেবল দর্শকের মতো হয়, তবে জনতার হাতে বিচার প্রতিষ্ঠার প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পাবে। সমাজে বিশৃংখতা সৃষ্টি হবে। যা সরকার, রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য কোন রকমরে কল্যান বয়ে আনবে না। মাদক সেবনের অভিযোগ থাকলে তার মোকাবিলার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। মাদকবিরোধী অভিযান কোনোভাবেই লাঠিসোঁটা হাতে দলবদ্ধ হামলা, মারধর কিংবা ধর্মীয় স্থানে ভাঙচুরকে বৈধতা দেয় না। বাংলাদেশে বহু মাজার, দরগাহ ও খানকাহ শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, এগুলো লোকঐতিহ্য, সুফি সংস্কৃতি এবং সামাজিক সহাবস্থানের অংশ। একটি স্থানে অপরাধের অভিযোগ থাকলে অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা হবে, কিন্তু পুরো প্রতিষ্ঠান বা অনুসারীদের লক্ষ্যবস্তু বানানো সভ্য রাষ্ট্রের চরিত্র হতে পারে না।

একটি বিষয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, ভোটের আগে সবাই মাজারে যায়, কিন্তু মাজারে হামলা হলে কেউ সহমর্মিতা দেখাতে আসে না। সাম্প্রতিক সময়ে মাজার ও মাজার ভক্তদের ওপর হামলা প্রকৃত পক্ষে বিরুদ্ধ মতের ওপর হামলা।মাজার ভাঙা, মাজারে হামলা, ওরস বন্ধ করা, দরবারে ভয় দেখানো, পীর-মুরিদদের অপমান করা, অথবা প্রশাসনের ছত্রছায়ায় ঘৃণা ছড়ানো—এসব কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য না। ধর্মীয় মতভেদকে সহিংসতায় পরিণত করা ইসলামবিরোধী, গণবিরোধী এবং রাষ্ট্রবিরোধী কাজ। যারা মাজারকে আক্রমণ করছে, তারা আসলে জনগণের স্মৃতি আক্রমণ করছে। এই দেশের ইসলাম মাঠে, নদীতে, মাজারে, মসজিদে, দরবারে, মায়ের দোয়ায়, ফকিরের গানে, দরিদ্রের রুটিতে, মজলুমের আর্তিতে গড়ে উঠেছে। মাজারে হামলা কোনো অজুহাতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। মাদকবিরোধী বা অন্য কোনো অভিযান যদি পরিচালনার প্রয়োজনও হয় সেই দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। সেটিও হতে হবে আইনের সীমার মধ্যে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত ও বিচার হবে আইনগত প্রক্রিয়ায়, হামলা বা ভাঙচুরের মাধ্যমে নয়। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে মাজার ও সুফি দরগায় হামলার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। ফলে হযরত শাহ আলী বোগদাদী (রহ.) মাজারের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নাই। এ ধরনের হামলা যদি ধারাবাহিকভাবে ঘটে, তাহলে তা সামাজিক অস্থিরতা ও বিভাজনকে উসকে দিতে পারে। মত ও বিশ্বাসের ভিন্নতা থাকতেই পারে। তবে সেই ভিন্নতার প্রকাশ সহিংসতার মাধ্যমে হলে তা রাষ্ট্র ও সমাজ কারও জন্যই শুভ নয়।

মাজারে হামালার ঘটনায় যে বা যারাই জড়িত থাকুক না কেন তাদের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে সরকারকে। রাজনৈতিক দলগুলোরও এ বিষয়ে দায়িত্ব রয়েছে, সেই দায়িত্ব পালন করতে হবে। তাদেরকে সহিংসতা, উগ্রতা ও সাংস্কৃতিক অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। নীরবতা বা অস্পষ্ট অবস্থান গ্রহন করে সমাজে ভুল বার্তা দেয়া সঠিক হবে না। রাষ্ট্র যদি সময়মতো স্পষ্ট বার্তা না দেয়, তাহলে আজ মাজার, কাল অন্য কোনো ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক পরিসর একই ধরনের হামলার শিকার হবে। আইনহীন জনআক্রোশ কখনো নৈতিক সমাজ গড়ে না; বরং রাষ্ট্রের কর্তৃত্বকে ক্ষয় করে। শাহ আলী মাজারের ঘটনা তাই কেবল একটি রাতের সহিংসতা নয়, এটি সরকারের জন্য আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। বাংলাদেশকে নতুন করে গড়তে হলে ধর্মের প্রশ্নে মানুষকে যুদ্ধের ময়দানে ঠেলে দেয়া যাবে না। মাজারের ওপর হামলা শুধু ইট-পাথরের ওপর হামলা না; এটা জনগণের স্মৃতি, বিশ্বাস, ভক্তি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মিলনের ওপর হামলা। এই হামলা প্রতিরোধে সকলকে এক সাথে কাজ করতে হবে।

[লেখক : কলাম লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক]
E-mail : gmbhuiyan@gmail.com

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ